মঙ্গলবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৩

ছুটি মঞ্জুর


বিশ্বের সব অন্ধকার যেইখানে পড়ে,
সেখান থেকে তুমি কেন ডাকো আমারে।
তুমি তো জানোই, মাঝে মাঝে আমি ভীষণ পার্থিব।
অথবা মগ্ন থাকি সাধনায় দোকানে দোকানে।
একদিন কোন এক জটিল চক্রান্তে বিচ্ছেদ তোমার সাথে।
তপস্যা করেছি দশ মাস দশ দিন।
হাসির স্তুপে চাপা পড়ে গেছে আমার ক্রন্দন।
তারপর একদিনও যায়নি তোমায় না ভেবে।
রোজ ভাবি ফিরে যাই তোমার আঁচলে।
কিন্তু জানোনা তুমি, কী টান আছে চোখের ভাষায়, দাঁতের ঝিলিকে।
জানোনা চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস কী মায়া জানে।
পিঠ বেয়ে ঘাম ঝরে রক্তবিন্দু তার ওপর চড়ে।
তখন কান ভারি হয়ে আসে, শুনিনা ডাক।
তবে কারা যেন বলে গেল, কাজ শেষ হল, যেতে পারো।

১৪/৬/২০১৩

স্বাধীন প্রেম

ভালবাসা এক অধিকার বোধ,
কুক্ষিগত করে রাখার তুমুল প্রচেষ্টা,
নিজেকে ব্যাপ্ত করার নিগূঢ় ইচ্ছা,
নিজের অজান্তে ঘটে যাওয়া বিচক্ষণ চক্রান্ত,
শরীরের কণায় কণায় বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।

এবার ভালবাসা তুমি স্বাধীন হও,
সরে যাও, স্বার্থের পাঁজর থেকে মুক্ত হও।

২৬/৬/২০১৩

সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৩

নিজের জন্য

একটু ভালবাসতে চাই।
তন্দ্রা ঝেড়ে উঠে বসে আয়নায় মুখ দেখতে চাই ।
প্রসাধনীর প্রাচুর্যে ধুয়ে মুছে যাক চামড়ার ছাই।
জটা ধরা চুল থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চাই অনিচ্ছা সন্ন্যাস।
পোষাকে পদচারণায় শয়নগৃহে আসুক বিন্যাস।
একটু ভালবেসে দেখি নিজেই নিজেকে।
লাল ফুল খুঁজে পাব ঋতু ব্যতিরেকে।

30/10/2015

বুধবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৩

মৃত্যুসংবাদ (কবিতা)



তুমি যখন আসবে
তখন ঘাস ফুটে যাবে কবরে।
শীতের শিশিরের সাথে মিশিয়ে দিও
একটি ফোঁটা প্রতিবিম্ব অশ্রু।
আমার বিশ্বময় আগুনের দাউদাউ
শান্ত হয়ে যাবে।
আমার স্বয়ংক্রিয় হাতে গড়ে ওঠা বিশ্ব
উঠে দাঁড়াবে প্রাণ ফিরে পেয়ে।
আরেক সহস্রাব্দের দিকে পা বাড়াবে
সেরে নিতে ফেলে রাখা কাজ।

৫ অক্টোবর ২০১৫ ফেসবুক পোস্ট

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৩

শিক্ষা ব্যবস্থায় দোষারোপের প্রবণতাঃ অবসাদ ও আরোগ্য -- ৫

পরিচালন সমিতি নিয়ে কিছু বলতে হয়। আগেই বলেছি, এটি রহস্যময় সমাজের আর‌ও রহস্যময় প্রতিনিধি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এক সময়ে অযোগ্য ব্যক্তিরাই নিয়োজিত হতেন স্কুল পরিচালনার কাজে। অবশেষে যোগ্যতা নির্ধারিত হয় সার্টিফিকেটের উপর ভিত্তি করে, আর দূরীভূত হয় রাজনৈতিক প্রভাব। কিন্তু পাঁচ বছর যেতে না যেতেই সেই ভুল ভেঙে যায় শাসনতন্ত্রে থাকা লোকজনের। আবার আগের অবস্থা ঘুরে এসেছে অনেকটা। ফলে তেমন কোনও ভূমিকা রাখার মতো ক্ষমতা বা যোগ্যতা এদের অনেকেরই নেই। এমনিতেই তেমন কিছু অবদান রাখার মত ক্ষমতা পরিচালন সমিতির নেই বললেই চলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ্যতার মাপকাঠি তো প্রায় অনুপস্থিত।
     পরিচালন সমিতি গঠনের পর সভাপতি বা সভানেত্রী ছাড়া বাকিরা ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নেন। ফলে বিদ্যালয়ের প্রধানের সঙ্গে যদি তার মিল থাকে তাহলে উন্নয়ন না হলেও চলে। বাকিরা একমাত্র আর্থিক অনুদানের খবর পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ফলে রোজ দিনের তদারকি করা, দফায় দফায় বৈঠক করে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া এসব আর হয়ে ওঠে না। এমনটা না হলে তেমন দূরদর্শী ও মজবুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।  আর যদি মিল না থাকে তাহলে তো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
    শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে পরিচালন সমিতির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দরকার। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের ওয়াকিব করা, শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলা, শিক্ষকদের জন্য পরিবেশ তৈরি করা, অভিভাবকদের সক্রিয় করা ইত্যাদি অনেক কিছুই করার আছে। কিন্তু সেই সমন্বয় সাধন সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রশিক্ষণের নামে প্রহসন হয়। যথাসম্ভব তাদের কাছে তথ্য গোপন রাখা হয়। এতে যুগপথ ভয় ও চালাকি কাজ করে। এছাড়াও সদস্যদের মধ্যে মতভেদ জিইয়ে রাখারও চেষ্টা চলে।
   বেশিরভাগ অভিভাবক সদস্য সচেতন নন। তাই সরকারি প্রতিনিধিরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কারিগর। অন্যান্য সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থাকাই শ্রেয় মনে করেন। কারণ পরিচালন কমিটির ক্ষমতা বলতে সুপারিশ করা ছাড়া তেমন কিছুই নেই। সে সুপারিশ আধিকারিকদের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। অনেক ক্ষেত্রে এর দীর্ঘসূত্রিতা নৈরাশ্যের জন্ম দেয়। মনে হয় যেন আর করার কিছুই নেই। এরপরেও রয়েছে অন্যায় আবদার থেকে হুমকি-ধমকি পর্যন্ত। হলে অনেকেই স্বজন পোষণ, পক্ষপাত ইত্যাদিতে বাধ্য হয়ে পড়েন।
  যারা আপোষ করতে চান না, তাদের অনেক কসরত করতে হয়। মোকাবেলা করতে হয় অপমান, অপবাদ থেকে শুরু করে মিথ্যা মামলা পর্যন্ত। এত্তসবের বিনিময়ে তাঁদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বলতে কিছুই থাকে না। বরং গাঁটের পয়সা খরচ করতে হয়, সময় দিতে গিয়ে নিজের পেশায় ধস ধামাতে হয়। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আর কি! তাই শিক্ষক ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সঠিকভাবে স্কুল পরিচালনা সম্ভব হয় না।

শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২২

শিক্ষা ব্যবস্থায় দোষারোপের প্রবণতাঃ অবসাদ ও আরোগ্য -- ৪

অভিভাবক ছাড়া শিক্ষা হয় না। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে সচেতনতার প্রস্তাব রেখে জ্ঞান ঝাড়লে চলবে না। তাঁদেরকে এই ব্যবস্থায় জড়িত করতে হবে। অনেক সচ্ছল তথা শিক্ষিত অভিভাবক সচেতন নন, তাই এ ব্যাপারে সচেতন মহলের আন্তরিকতা জরুরি। কিন্তু এই আন্তরিকতা আদায় করতে হলে কিছু বিশেষ পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

অভিভাবকদের বোঝাতে হবে যে স্কুল কোন‌ও যন্ত্র নয় যেখানে ঢুকেই তাঁর সন্তান সফল মানুষ হয়ে বের হবে। কাগজ-কলে যেমন একদিকে বাঁশ ঢুকলে আরেক দিকে কাগজ হয়ে বের হয়, বিদ্যালয় তেমন কোনো কল নয়, আর তাঁর সন্তানটিও কোনো কাঁচামাল নয়। সে একটা জীবন্ত মানুষ শিশু। সে অনেক কিছুই বোঝে, অনেক কারণেই তার মনে ঢেউ ওঠে, তার নিজস্ব চাওয়া পাওয়া আছে। কিন্তু তাই বলে সে সুবোধ শান্ত নিরীহ নয়। সে অনেক কথা লুকিয়ে রাখে, অনেক কথা বাড়িয়ে বলে। শিশু মনস্তত্বের পন্ডিতদের‌ও ভুল হয়ে যায়। কখন শাসন একটু বেশি হয়ে গেল, কোথায় একটু আস্কারা পেয়ে গেল, কোন শিশুর প্রশংসা দরকার, কাকে কী ভাষায় তিরস্কার করতে হয়, কীভাবে রাশ ধরতে হয়, কাকে টান দিতে হয়, কাকে ধাক্কা দিতে হয় ইত্যাদি।

অনেকের ধারণা, আমি যাচ্ছেতাই করি, কিন্তু আমার সন্তান হবে একান্ত সুবোধ। তিনি হয়তো ধনী হয়েছেন, তাই শিক্ষিত মানুষগুলোকে তাঁর মনে হয় মূর্খ। তাই দিনরাত শিশুদের সামনে শিক্ষকদের গালমন্দ করেন। এতে তিনি হয়তো পরিতৃপ্তি পেতে পারেন। কিন্তু তাঁর সন্তানও তো তাই শিখবে। তাই সন্তানের সামনে শিক্ষকের সমালোচনা করা বা হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা সন্তানটির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার পক্ষে যথেষ্ট। অভিভাবক নিজেই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন দিনরাত, রাত বিরেতে ঘুরঘুর করবেন কাজে অকাজে, বাড়িতে রোজ দিন আড্ডা জমাবেন, উপদ্রব করবেন আর সন্তানটি সারাদিন ভালো হয়েই চলবে — তা কি সব সময় হয়?

বেসরকারি বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের অভিভাবকদের ধারণা, 'আমি টাকা দিচ্ছি আর কী করব।' সরকারি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ধারণা প্রায় একই — 'মোটা অংকের মাইনে দেয় সরকার, আমি কেন খেয়াল রাখব?' আসলে অভিভাবকত্ব তো শিখতে হয়। বেশিরভাগ মা-বাবা যে অভিভাবকত্ব শিখতে আগ্রহী নন তা বোঝা যায় যখন অভিভাবক-শিক্ষক বৈঠক হয়, আর উপস্থিতি হয় ১০ শতাংশের মতো। উপস্থিত অভিভাবকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নিরব থাকেন, আর ১৫ শতাংশ শিক্ষকদের শিক্ষা দেওয়ার মতলবে কুণ্ডলী পাকানোর চেষ্টা করেন, ৫ শতাংশ সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবেশ পরিবর্তনের ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

নিয়ম মতে শিক্ষক-অবিভাবক সমিতি থাকার কথা। বেশীরভাগ বিদ্যালয়ে তা নেই, থাকলেও তা নাম মাত্র। আসলে বেশিরভাগ মানুষ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফল লাভ করতে আগ্রহী। তাই ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতির প্রতি এক ধরণের অনীহা কাজ করে। সরকারি উদ্যোগের বিফলতার অন্যতম কারণ এটি। অভিভাবকদের অংশগ্রহণে প্রতি অনীহার পিছনে এই মানসিকতা অনেকটা দায়ি। এই সমিতি গঠন হওয়ার পর দু'একজন সদস্যই উপস্থিত থাকেন। বাকিরা বলেন, 'আপনারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাতে আমাদের সম্মতি আছে।' এভাবে কিছুদিন পর সক্রিয় সদস্যরাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

পরিচালন সমিতির এক বড় অংশ জুড়ে থাকেন অভিভাবকরা। কিন্তু সেখানেও সেই একই অবস্থা। লক্ষ্য গুরুত্ব হারিয়ে উপলক্ষের দিকে পাল্লা ভারি হয়ে যায়। অর্থাৎ শিশুদের সার্বিক বিকাশ তাদের কাছে গৌণ, মুখ্য হয়ে পড়ে আর্থিক লেনদেন। এছাড়াও রয়েছে মাতৃগোঠ ইত্যাদি। কিন্তু কিছুই মূল উদ্দেশ্যকে সার্থক করতে পারে না। ব্যস্ততা এখন একটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে গেছে। কেন যে অভিভাবকরা সন্তানের জন্য দু'দণ্ড সময় দেওয়ার বদলে একটু বেশি রোজগারের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরেন তা বোঝা মুশকিল। অবশ্য প্রান্তিক মানুষ এসব সমিতিতে থাকেন না বললেই চলে। থাকলেও তাঁদের কিছু বলার বা করার থাকে না। তাঁদের ব্যস্ততাও অন্য ব্যাপার।
একবার এক অবিভাবককে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনার ছেলের নাম বলুন।' প্রথমটায় একটু থতমত খেয়ে তারপর রাগে আগুন হয়ে ডাক দিলেন, 'হোই খানো যাস গিয়া খালি, অবায় আয়। তোর নাম কিতা খো।' আরেকবার এক ছাত্রের অভিভাবককে ডেকে জানানো হলো, তাঁর ছেলে প্রতিদিন স্কুলের কিছু না কিছু ভাঙচুর করে। তাঁর জবাব, 'অতার লাগি আবার ডাকা লাগেনি! সরকারে প‌ইসা দের না নি! ল‌ই লাওনা আবার।' এ ধরনের অভিভাবকের কাছে সন্তানের শিক্ষা নিয়ে কী আর আলোচনা করা যায়! বেশিরভাগ অভিভাবক সন্তানের রোল নম্বর, ক্লাস ইত্যাদি জানেন না। এ বিষয়ে তার কী জ্ঞানাঅর্জন হল সেই আলোচনার চিন্তাই করা যায় না....